যাকাত ইসলামের পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের একটি। আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে গভীর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে গরিব-দুঃখীদের হাতে অর্পণযোগ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদত এটি। হাদিস শরিফে এসেছে—
“تؤخذ من اغنيائهم وترد الى فقرائهم”
অর্থাৎ ধনীদের কাছ থেকে গ্রহণ করে তা তাদেরই দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।
ইসলামী শরীয়তে যাকাত ব্যয়ের খাত সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত। নির্ধারিত খাতের বাইরে যাকাত ব্যয় করলে তা গ্রহণযোগ্য হয় না। এমনকি যাকাত সঠিক খাতে ব্যয় হবে কি না তা যদি অনিশ্চিত থাকে, তবে সে ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠানে যাকাত প্রদান করাও বৈধ নয়।
খেলাফত ও মামালিকাতে আদেলার যুগে, যখন রাষ্ট্র কাঠামো ইসলামী শরীয়ত অনুসরণের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল, তখন ধনীদের প্রকাশ্য যাকাতযোগ্য সম্পদ (الاموال الظاهرة) থেকে সরকারিভাবে যাকাত আদায় করা হতো এবং শরীয়ত নির্ধারিত খাতে তা ব্যয় করা হতো। তবে গোপন সম্পদ (الاموال الباطنة)-এর যাকাত তখনও ব্যক্তি নিজেই আদায় করতেন।
পরবর্তীকালে মুসলিম বিশ্বের বহু দেশে শরীয়ত অনুসরণের ব্যাপারে রাষ্ট্র কাঠামোর উদাসীনতা দেখা দেয়। ফলে সাধারণ দ্বীনদার মুসলমানরা রাষ্ট্রের মধ্যস্থতা পরিহার করে প্রকাশ্য সম্পদের যাকাতও সরাসরি গরিব-দুঃখীদের হাতে পৌঁছে দিতে শুরু করেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারি মধ্যস্থতা ছাড়াই সরাসরি যাকাত প্রদান করার মাধ্যমে ধনী ও গরিবের মাঝে এক ধরনের কৃতজ্ঞতার বন্ধন ও সামাজিক সম্প্রীতি গড়ে ওঠে। দীর্ঘদিনের চর্চায় আমাদের উপমহাদেশে এই প্রথা সামাজিক সংস্কৃতি ও বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।
এমতাবস্থায় যে সব দেশে কাঠামোগত দুর্নীতি ও খেয়ানত ব্যাপক, যেখানে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলো লুটপাটের কারণে ব্যর্থ হয়, ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ পেতে নাগরিকদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়, কিংবা পেনশনের অর্থ তুলতেও অনেকে ঘুষ দিতে বাধ্য হন—সেসব দেশে যাকাতের মতো একটি পবিত্র আর্থিক ইবাদত সরকারের হাতে তুলে দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও যেখানে প্রকৃত অর্থে ইসলামী শাসনব্যবস্থা নেই, শরীয়ত অনুসরণের সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি নেই, এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরে অসাধু ব্যক্তিদের দৌরাত্ম্য বিদ্যমান—সেখানে যাকাত ব্যবস্থাকে সরকারিকরণের উদ্যোগ নতুন ধরনের দুর্নীতি ও অপরাধের পথ উন্মুক্ত করতে পারে। এর ফলে দরিদ্র মানুষের বঞ্চনার নতুন দ্বারও সৃষ্টি হতে পারে।
বিশেষত সরকার যখন যাকাত আদায় করবে, তখন তা রাষ্ট্রের অন্যান্য কর বা ট্যাক্সের সঙ্গে এক ধরনের সমান্তরাল ব্যবস্থায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে যাকাতের ধর্মীয় গুরুত্ব ও পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ হওয়ার সম্ভাবনাও দেখা দেয়। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
বর্তমান ধর্মমন্ত্রী কিংবা প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সদিচ্ছা সাময়িক বিষয়। কিন্তু একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। যেমন আমরা ধর্মীয় শিক্ষাকে সম্পূর্ণ সরকারি করণের বিরোধিতা করি, তেমনি রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া যাকাত ব্যবস্থাকে সরকারিকরণের বিরোধী।
এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনা, পর্যালোচনা ও জাতীয় পর্যায়ে মতবিনিময়ের জোর দাবি জানানো হচ্ছে।
.jpg)