তিনি ছিলেন ইখলাস ও লিল্লাহিয়্যাতের বাস্তব প্রতিচ্ছবি!
মাওলানা আবদুস সালাম আযাদ
তিনি ছিলেন ইখলাস ও লিল্লাহিয়্যাতের বাস্তব প্রতিচ্ছবি!
মাওলানা আবদুস সালাম আযাদ
এক.
২০১০ ঈ.'র ২৬ শে ফেব্রুয়ারি। আমাদের এতিম করে পরপারে চলে গেলেন, সিলেটের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামিয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর এর ৩২ বছরের সফল মুহতামিম ও আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর জামে মসজিদের দীর্ঘ ৫৭ বছরের ইমাম ও খতিব হযরত মাওলানা শায়খ আবদুল হাই রাহিমাহুল্লাহ। তাঁর চলে যাওয়ার বয়স আজ ৯ বছর পূর্ণ হলো। আল্লাহ! যেনো তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের উচ্চাসনে সমাসীন করেন। আ-মীন!
দুই.
আজ থেকে ১৬ বছর আগের কথা। আমি জামিয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুরে ইবতেদায়ী ৫ম বর্ষের নতুন ছাত্র। হুযুর থাকতেন নতুন মাদরাসায়। আমিও নতুন মাদরাসার ৩ নং কামরায় থাকতাম। হুযুরের খাদিম ছিলেন আমার চাচাতো ভাই দারুস সুন্নাহ মুরাদগঞ্জ মাদরাসার উসতায, মাওলানা হাফিয আবদুল খালিক মাসউদ। তিনি হুযুরের খাদিম হওয়ার সুবাধে আমিও এক থালে ও এক দস্তারখানে বসে হুযুরের সঙ্গে খানা খেতাম। তখনো পুরোপুরি হুযুরের ব্যক্তিসত্তা বুঝতে পারার যোগ্যতা আমার ছিলো না। কৈশোরের দূরন্তপনা আমার মধ্যে পুরোমাত্রায় বিকশিত। না নিষেধ, বড় ছোটোর কোনো পার্থক্য অনুধাবন করতে পারতাম না। দুষ্টুমিতে মাতিয়ে তুলতাম গোটা পরিবেশ। ছোট্টবয়সেরও দু'চারজন ছাড়া তেমন কোনো ছোট্ট ছাত্রও ছিলো না তৎকালীন সময়ে। হুযুরের দুই ভাতিজা যথাক্রমে হাফিয ফারুক ও হাফিয খলিল( ১৫ ঈসায়ির শেষের দিকে সে মৃত্যু বরণ করে)। হাফিয শিহাব, কাযী আফতাব ও আমিই ছিলাম ছোটদের মধ্যে।
তিন.
হুযুর ছিলেন সুন্দর চেহারার সফেদ সশ্রুমণ্ডিত। সত্তোর্ধ মুরব্বী। একেবারে দাদার বয়সি। নানা রোগ-যাতনা ও মাদরাসার ইহতেমামি দায়িত্ব পালনের ব্যস্থতায় ক্লাসিক্যাল দারস্ প্রদান থেকে ছিলেন অবসর। প্রতিদিনই মাদরাসার কোনো না কোনো কাজে ব্যতিব্যস্ত থাকতেন। মাদরাসার সার্বিক খবরা খবর রাখতেন। আয় উন্নতির ফিকির করতেন। মাদরাসার নির্মাণকাজে নিয়োজিত মিস্ত্রীদের পাশে থেকে তাদের কাজের দেখভাল করতেন। সেসময় নতুন মাদরাসার উত্তর (লণ্ডনী) বিল্ডিংয়ের নির্মাণ কাজ চলছিলো। পশ্চিম বিল্ডিংয়ের নীচতলায় বারান্দারও আংশিক কাজ বাকি ছিলো। হুযুর লাঠি হাতে নিয়ে এগুলো পর্যবেক্ষণ করতেন। লাঠি ছিলো হুযুরের কাজ পরিমাপ করার যন্ত্র। লাঠির মাধ্যমেই কাজের কমবেশি হুযুর ধরতে পারতেন।
চার.
আমার দাদা নেই। পিতাজির ছোটকালেই দাদাজি ইন্তেকাল করেন। দাদাকে দেখি নি। হুযুরকে দেখে দাদাজি বানিয়ে নেই। একদিন সকাল বেলার ঘটনা- হুযুর মাদরাসার বারান্দা দিয়ে লাঠিতে ভর করে হাটছেন। আর আমি দুষ্টুমির ছলে হুযুরের পিছু নিয়ে অমনি লাঠিতে টান দিয়ে বসি। দাদার সঙ্গে যেভাবে নাতিরা মজাক করে ঠিক সেভাবেই। কৈশোরের দূরন্তপনায় আমি এমনটি করেছি। তখন এতো কিছু বুঝে উঠার ক্ষমতা বা যোগ্যতা কোনোকিছুই ছিলো না আমার। আমার আকস্মিক এ ঘটনা দেখে হুযুরও ঘাড় ফিরিয়ে লাঠি উচুঁ করে আমাকে ধাওয়া করেন। তখন আমার নাগাল আর পায় কে? দৌড়ে পালিয়ে বাঁচলাম।
খানা খেতাম কিন্তু হুযুরের সঙ্গে। সকালের খানা হযুরের খাদিমরা তুলে এনে দস্তারখানে রেডি করলেন। খেয়ে সবাই ক্লাসে যেতে হবে। আমি তো আসামী। তাই সকালের খানা খেতে আমি আর গেলাম না। হুযুর খেতে বসলে সবাইকে নিয়ে। কিন্তু আমাকে দেখতে পেলেন না। উপস্থিতিদের জিজ্ঞেস করলেন আমি কই। তারা কিন্তু সকালের ঘটে যাওয়া ঘটনাটি সম্পর্কে বেখবর। কিছুই জানে না। তারা জবাব দিলো- আমি বলেছি খানা খাবো না। হুযুর তাদের জানিয়ে দিলেন, যতক্ষণ না আমি এসে খানায় শরীক না হই ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ খানায় বসতে পারবে না। যাক, শেষ পর্যন্ত অনেক ভয় ও সঙ্কোচ নিয়ে কাঁচুমাচু হয়ে দস্তরখানে শরীক হলাম। অথচ, সকালে তাঁর সঙ্গে যে দৃষ্টতা দেখিয়েছি তার কিছুও উল্লেখ করে আমাকে ধমক দেন নি। এই ছিলো ছোটদের প্রতি হযরতের অগাধ স্নেহ আর মায়া মমতা।
ওইদিন বাদ আসর। হযরত তাঁর কক্ষে আমাকে তলব করলেন। আমি গেলাম। সালাম দিয়ে কক্ষে প্রবেশ করলাম। উত্তর দিয়ে ইঙ্গিত করলেন নিচে বসার। তখনো আমার মনে শঙ্কা ছিলো এই বুঝি! আমাকে শাস্তি দিবেন। না তিনি কিছু বললেন না। ব্যাগ থেকে বের করে খেতে দিলেন একটি লাড্ডু (খৈয়ের মোয়া)। আমি ইতস্তবোধ করে রেখে দেই আমার হাতে। তখন হযরত অত্যন্ত দরদী হৃদয়ে শোধরে দিলেন সকালের ঘটনা। নরমকণ্ঠে বললেন- আমি বুঝে নিয়েছি তুমি আমাকে নিয়ে মজা করেছো। কিন্তু কী জানো, মুরব্বীদের সাথে এমন ব্যবহার করতে নেই। দোষ। তা পারে না। আল্লাহ নারায হন। আর ভবিষ্যতে কারো সঙ্গে এমনটি করো না। আমার স্বীকারোক্তি নিয়ে বললেন- আর কোনোদিন এমন করবে? আমি প্রতিউত্তরে জ্বী না বলে সম্মতি জানালাম। এই ছিলো বিশাল হৃদয়ের অধিকারী দরদী মুরব্বীর ছোটদের সংশোধন করার অভিনব পদ্ধতি।
পাঁচ.
হযরত রাহ. আমাকে যে এতো স্নেহ করতেন, তা ভাষায় ব্যক্ত করতে পারবো না। এরপরও যেহেতু স্মতিচারণ করছি, সেহেতু কিছু কথা প্রকাশ করতেই হয়। হুযুর মাদরাসার চাঁদা কালেকশনে মাদরাসা এলাকার বিভিন্নপ্রান্তে তাশরীফ নিতেন। প্রতিদিনই মাদরাসার বোর্ডিং খরচের টাকা সংগ্রহ করতেন। আজ এ গ্রাম। কাল এ গ্রাম এভাবে রুটিন করে নিতেন।
তো প্রায়ই সফরে হুযুর আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। আমিও তাঁর সঙ্গে অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে যেতাম। হুযুর ছিলেন রোগাক্রান্ত। হাপাঁনী রোগ ছিলো হুযুরের নিত্যসঙ্গী। ডায়বেটিসও ছিলো নিয়মতান্ত্রিক। আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর থেকে লাউঝারী পায়ে হেটে যাওয়া হতো। রিক্সা বা নৌকার কোনো প্রয়োজন থাকতো না। কিছু সময় চলার পর হুযুর বসে পড়তেন। সামান্য পর আবার হাটতে থাকেন। আমারও যে পায়ে ব্যথা হতো না তা নয়।
এমনও হতো- আমি হুযুরকে বলতাম, হুযুর! আর হাটতে পারবো না। তাছাড়া আপনিও যে অসুস্থ। আমি রিক্সা ডেকে নিয়ে আসি। বাকি পথটুকু তাতে চড়ে পৌঁছি। হুযুর আমার কথা শুনে বলতেন, রিক্সায় বা নৌকা চড়ে যাওয়ার পয়সা আমার কাছে নেই। যা আছে তা তো মাদরাসার। মাদরাসার টাকা আমি খরচ করতে পারবো না। আমি বলতাম, তাতে কী হয়েছে? আপনি তো মাদরাসার কাজে চাঁদায় বেরিয়েছেন। নিয়ম ছিলো মাদরাসা আপনার যাতায়াতের খরচ বহণ করবে। হুযুর মৃদু হেসে বলতেন- বাবা! মাদরাসার যিম্মাদার যেহেতু আমি। তাই মাদরাসার দু'চার টাকা যদি বাঁচাতে পারি, তাতে অসুবিধা কী? এমন কথা শুনে আমি আর আমার কথা বাড়াতাম না।
এভাবে ফিরার পথে কুড়ার বাজার এসে বায়না ধরতাম, বটবৃক্ষের উত্তরপার্শ্বে অবস্থিত চায়ের হোটেলে গিয়ে চা খাওয়ার। সে হোটেলের দুধ চা ছিলো খুবই তৃপ্তিদায়ক। হুযুর চা খেতে না করতেন। বিনিময়ে আমাকে এক টাকার দুটো চকলেট কিনে দিতেন। নিজে যত্রতত্র অযথা কোনো কিছু খেতেন না। তিনি ছিলেন সীমাহীন মিতব্যয়ী। অপচয় খরচ করতে পছন্দ করতেন না। তবে দ্বীনি স্বার্থে খরচ করতে ছিলেন উদারহস্ত।
ছয়.
হুযুর ছিলেন ধৈর্য্যের পাহাড়। তাকওয়ার আধার। সুন্নতের পাবন্দ। তাঁর পা থেকে মাথা পর্যন্ত ছিলো সুন্নতের রঙে রঙীন। কথা-বার্তায়, চাল-চলনে ছিলেন অতুলনীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। যবানের ভাষা ছিলো খুবই মিষ্ট ও নম্র। আওয়াযে ছিলো একধরণের মিউজিক্যাল প্রতিধ্বনি। যা শুনতে খুবই ভালো লাগতো।
তাঁর ব্যক্তিসত্তায় ছিলো অনুপম যাদুকরী প্রভাব। লোকেরা তাঁকে সীমাহীন ভক্তি-শ্রদ্ধা ও মুহাব্বাত করতো। যে কেউ তাঁর কথা না মেনে পারতো না। তিনি কাউকে মাদরাসার জন্যে কোনোকিছু দিতে বলেছেন, সে যতোই পাষাণ হৃদয়ের অধিকারী হোক না কেনো সে নির্দ্বিধায় তাঁর কথাকে নতশীরে মেনে নিতো। দিয়ে দিতো সবকিছু। এমন দু'একটি ঘটনা আমি আমার নিজ চোখে দেখেছি।
মজার কথা! আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর ও তৎপার্শ্ববর্তী এলাকার লোকদের মধ্যে কেউ তাঁর নানা, মামা, কেউ ভাই এমন ছিলেন। তিনি তাঁদের উল্লেখিত শব্দে সম্বোধন করতেন। তারাও তাঁকে নাতি, ভাগনা, ভাই বলে বরণ করে নিতেন। আঙ্গুরা মুহাম্মদপুরের ইমাম থাকাকালীন সময়ে রাত্রে কোনো দিকে বেড়াতে গেলে এলাকার লোকজন তাঁকে দেখে লুকিয়ে যেতেন। যাতে তিনি যেনো তাদের না দেখেন। তিনি যাওয়ার পর তারা বের হতো। এই ছিলো তাঁর প্রতি জনসাধারণের ভীতিকর শ্রদ্ধার কিঞ্চিৎ বিবরণ।
সাত.
আমানত ও দিয়ানতের ক্ষেত্রে হুযুর ছিলেন খুবই যত্নবান। হক্কুল্লাহ ও হক্কুল ইবাদের বেলায় ছিলেন সদা-সচেতন। এক্ষেত্রে মোটেও অবহেলা করতেন না। মাদরাসার ছিলো পাঁচটি ফাণ্ড। এগুলোর জন্যেক ছিলো আলাদা আলাদা পাঁচটি থলি। ভুলেও এক ফাণ্ডের টাকা অন্য ফাণ্ডের থলেতেুু্ যেতো না। হিসাব-নিকাশ ছিলো খুবই স্বচ্ছ। এলাকার লোকরাও তাঁর কাছে টাকা-পয়সা আমানত রাখতো। তিনি যথাসময়ে তাদের আমানত বুঝিয়ে দিতেন। ব্যক্তিগত প্রয়োজনে কোনোদিনও তাঁদের এ টাকাগুলো খরচ করতেন না। অথচ যারা টাকা রাখতেন, তারা তাকে প্রয়োজনে খরচেরও অনুমতি দিয়ে দিতেন। তা সত্ত্বেও তিনি এমনটি করতেন না। আর্থিক দৈন্যদশায় তিনি আল্লাহর প্রতি ভরসা রাখতেন। মাদরাসার লাখ লাখ টাকা তাঁর কাছে জমা থাকতো। তিনি যেভাবে টাকা রাখতেন, ঠিক সেভাবেই তা সংরক্ষিত থাকতো।
আট.
জামিয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুরের উন্নতি ও অগ্রগতি ছিলো হুযুরের জীবনের ব্রতি। জামিয়াকে লেখা-পড়ার মানদণ্ডে বিশ্বদরবারে উচুঁ করে তুলতে তিনি ছিলেন বদ্ধপরিকর। নীরবে জামিয়ার শিকড়ে পানি সিঞ্চন করেছেন। তিনি তিলে তিলে জামিয়াকে গড়েছেন। আর সরবে আল্লামা শায়খ যিয়াউদ্দীন এ নববী কাননকে খ্যাতির উচ্চশিখরে নিয়ে এসেছেন। হুযুর থাকতেন পিছনে। সামনে রাখতেন তাঁর প্রিয় ছাত্র ও দীর্ঘদিনের সহকর্মী আল্লামা শায়খ যিয়াউদ্দীন দা.বা.কে। তিনি ছিলেন এখলাস ও লিল্লাহিয়্যাতের মূর্তপ্রতীক। সব কাজ নিজে করতেন। কিন্তু জনসমক্ষে নিজেকে প্রকাশ করতেন না। ছিলেন বিশাল প্রতিষ্ঠানের যিম্মাদার। প্রিন্সিপাল। এতে কোনো অহঙ্কার তাঁর মধ্যে কাজ করতো না। নিজেকে লুকিয়ে রাখতেন। গোপন থাকতে চেষ্টা করতেন। বিশাল এ জামিয়া মাদানিয়ার মুহতামিম যে তিনিই সেকথা অনেক শিক্ষার্থী ছাত্র জানতো না। জানতো নাযিম সাহেব হুযুরই সবকিছু। প্রায় ছাত্র মনে করতো তিনি গ্রামেরই কোনো মুরব্বী হবেন। নামায পড়তে এখানে আসেন। এমন ছিলো তাঁর প্রতি ছাত্রদের সহজ সরল ধারণা।
নয়.
হুযুর ছিলেন সাহিবে নিসবত বুযুর্গ। মুসতাজাবুদ্ দাওয়াত আল্লাহর ওলী। তিনি ইবাদত বন্দেগিতে ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। রাতের শেষপ্রহরে লোকচক্ষুর আড়ালে নীরবে নিভৃতে চলতো নাওয়াফিলের সাধনা। চলতো আরশের প্রভুর কাছে জামিয়ার উত্তরোত্তর উন্নতি ও মুসলিম উম্মাহের কল্যাণ কামনায় অশ্রুসিক্ত রোনাজারি এবং বুকফাটা ফরিয়াদ। পবিত্র কুরআন মাজিদ তিলাওয়াতের মনোমুগ্ধকর সুর লহরী রাত্রির শেষ প্রহরে ইথারে পাথারে ভেসে উঠতো।
তাঁর কণ্ঠ ছিলো সুললিত। হৃদয়কাড়া। আরবী লেহাযের তেলাওয়াত ছিলো। যে শুনতো, সে তন্ময় হয়ে শুনতো। আমার পরিষ্কার মনে আছে- আমি একদিন রাত আড়াইটার পর ঘুম থেকে জেগে উঠি। পেশাব করার জন্যে। পেশাব শেষ করে রুমে ঢুকবো। এমন সময় কর্ণকুহরে ভেসে এলো তেলাওয়াতের শব্দ। ফলো করে করে হুযুরের রুম পর্যন্ত চলে আসি। এখানে এসেই স্পষ্ট শব্দ শুনতে পেলাম। চুপিচুপি কান খাড়া করে দরজায় রাখলাম। এভাবে কখন যে ফযরের আযান হয়ে গেলো। তা টের পাইনি। তিনি ছিলেন অত্যন্ত গুমনাম প্রচারবিমুখ। কোনো ক্ষেত্রে রিয়া বা তাকাব্বুরি প্রদর্শন করেননি। নিজেকে মিটিয়ে দিতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। নিজের অবস্থান জানান দিতে কখনো চান নি। বর্তমানের যামানায় তো লৌকিকতা প্রদর্শনকারীদের অভাব নেই।
দশ.
২০০৫ ঈসায়ীর ২৭ এপ্রিল বুধ বার। এদিনটি ছিলো শায়খুল হাদীস আল্লামা নুরুদ্দীন গহরপুরী রাহ. এর ইন্তেকাল পরবর্তী জানাযার দিন। ওইদিন আমাদের অত্রাঞ্চলে খুব বেশি বৃষ্টিপাত ও তুফান হয়েছিলো। সকাল বেলা হযরত রাহ. মাদরাসার চাঁদা কালেকশন করতে গিয়েছিলেন। জামিয়ার পার্শ্ববর্তী গ্রামে।
চাঁদা করে ফিরে আসেন জামিয়ার উদ্দেশ্যে। প্রবেশদ্বারে ঢুকতেই কে যেনো বললো- হুযুর! ছাত্রাবাসের তিনতলার টিনের চালা বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে গেছে। তিনি সেদিকে খিয়াল করতেই পা পিছলে পড়ে যান মাটিতে। এতে কোমরে মারাত্মক আঘাত পান। সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসার জন্যে নিয়ে যাওয়া হয় সিলেটে। ভর্তি হলেন দরগাহ গেটের পার্শ্ববর্তী আল-বান্না জেনারেল হসপিটালে।
ডাক্তার রিপোর্ট দেন তাঁর কোমরের হাড় ভেঙ্গে গেছে। হুযুরের ছাত্র-শিষ্য ও ভক্তবৃন্দরা খবর পেয়ে সেখানে তাঁকে দেখতে যান। আমিও গিয়েছি। আমি তাঁর শারীরিক অবস্থার খবর জানতে চাইলে বললেন- ভালো আছি। আমার জন্যে দুআ করবে, আল্লাহ যেনো আমাকে ঈমানের সঙ্গে মৃত্যু দান করেন। আমিও বললাম- ইনশা আল্লাহ! আপনার জন্যে দুআ করবো। ফিরে আসার সময় একটি কমলা ও একটি আপেল আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন- মেহমানদারি করতে পারিনি। এগুলো নাও। পথে খেয়ে নিয়ো। আমি দুআ নিয়ে চলে আসি।
আল-বান্না জেনারেল হসপিটালে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর চলে আসেন বাড়িতে। ইন্তেকাল পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত ঘরকেই একমাত্র স্থান বানিয়ে নেন। এভাবেই পরম বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাত করতে, পরম পবিত্র হওয়ার সাধনায় নিজেকে সঁপে দেন। মাঝেমধ্যে হুইল চেয়ারে চলা-ফিরা করতেন। অসুস্থতা দিন দিন বাড়তে থাকে। এতোকিছুর পরও ইবাদত বন্দেগিতে কোনো কমতি করেননি। রুটিন মাফিক প্রতিদিন কয়েক পারা কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করতেন। যিকির-আযকারে ব্যস্তসময় পার করতেন।
আমি বিয়ানীবাজার গেলেই হুযুরকে দেখতে যেতাম। হুযুরের দুআ নিয়ে আসতাম। হুযুর দুআ দিতেন। আমার বাবা-ভাইয়ের খবর নিতেন। মাদরাসা ও আহলে মাদরাসার খুঁজ খবর নিতেন। হুযুরদের কুশল জিজ্ঞেস করতেন। নাম ধরে ধরে হুযুরদের কাছে সালাম পাঠাতেন। নিজের খাতিমা যেনো ঈমানের উপর হয়, দুআ চাইতেন।
ইন্তেকালের এক সপ্তাহ আগে ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১০ ঈসায়ী রোজ বুধবার। কয়েকজন সাথী নিয়ে হুযুরকে দেখতে যাই। হুযুর আমাদের পরিচয় নিলেন। একে একে আমরা কে কোন জামাতে পড়ি ও বাড়ি কার কোথায়? জানালাম। আমাদের মেহমানদারি করতে বড় সাহেবজাদাকে নির্দেশ দিলেন। তিনি আমাদের মেহমানদারি করলেন। হুযুর আমাদেরকে আদর্শজীবন গঠনের নসীহত করলেন। আমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দুআ দিলেন। নিজের জন্যেও দুআ চাইলেন। হুযুরদের কাছে আমাদের মারফত সালাম পাঠালেন। খাস দুআর কথা বললেন। সময় কম ছিলো বিধায় আমরা চলে আসি। তখন কে জানতো? এটাই হবে হুযুরের সঙ্গে আমাদের শেষ দেখা। শেষ দুআ নিয়ে আমাদের ফিরে আসা।
.jpg)